অদ্ভুত প্যারাফেলিয়াঃ প্রাচীন মিশর ও কিছু অপরাধ
অদ্ভুত প্যারাফেলিয়াঃ প্রাচীন মিশর ও কিছু অপরাধ
- Ahamad Jubayer (Guest Writter)(Email : ajubair8806@gmail.com)
অপরাধবিদ্যা একটি মিশ্রবিদ্যা- বহু বিদ্যার অনেক বৈশিষ্ট্য এতে বিদ্যমান। কিন্তু এককভাবে যথেষ্ট পরিমাণে বিকশিত নির্দিষ্ট কোন শাস্ত্রের সাথে এর ব্যাপক কোন মিল নেই। এই মিশ্রণ এর সাধারণতার দ্যোতক হলেও একইসাথে এর আংশিক অনির্দিষ্টতাক প্রকাশ করে।
অপরাধবিদ্যা অনেকক্ষেত্রে 'আর্ট' হিসেবে রয়ে গেছে। কোথাও কোথাও এটা এখনও অভিজ্ঞতা ভিত্তিক বর্ণনা মাত্র (Empirical Description) - কোন কোন ক্ষেত্রে একটুও অগ্রগতি হয়নি। এর পদ্ধতি ও বিকাশগত ক্ষেত্রে Heuristic বা সৃষ্টিধর্মী কর্মের বিজ্ঞান হিসেবে এর বিকাশ অপরিহার্য।
অপরাধ মূলত মানুষের বিকৃত চিন্তাভাবনা থেকেই জন্ম দিয়ে থাকে। মানুষ মাঝেমধ্যে এমন সব কান্ড করে বসে যা তার কাছে বা তার মস্তিষ্কের কাছে আনন্দদায়ক হয়। কিন্তু তার এসব কর্মকান্ড সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় না এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডই মূলত তাকে অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়। অপরাধ কি শুধুমাত্র এই আধুনিক সমাজেই প্রচলিত? না। সেই আদিমকাল থেকেই অপরাধ হয়ে আসছে। আর আদিম বা প্রাচীন যুগের অপরাধগুলোর ধরণও ছিল একবারে অন্যরকম।
পূর্বের অনেক ইতিহাস পড়লেই আমরা এই অপরাধের সম্পর্কে অনেক তথ্য পেয়ে যাই। এছাড়াও যে সমস্ত প্রাচীন মিথগুলো প্রচলিত আছে সেগুলো থেকেও তথ্য পাওয়া যায়।
অপরাধের জগত হিসেবে প্রাচীন মিশর কে নানাভাবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। ঐ সময়ে মিশরের শাসনভার বিভিন্ন রাজার উপর ন্যস্ত থাকত এবং তাদের সংখ্যা ছিল অতি নগন্য। শোনা যায় যে তাদের বিভিন্ন রকম কর্মকান্ড এবনহ রাজ্যের প্রজাদের অমানবিক নির্যাতনের ফলেই অপরাধের জন্ম হয়ে থাকে।
মানুষের মস্তিষ্ক বিকৃত হয়ে গেলে তার দ্বারা যেকোন অপরাধমূলক কর্মকান্ড হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই কর্মকাণ্ড যখন অস্বাভাবিক বা অতিপ্রাকৃত হয়ে যায় তাকে যে কি বলা চলে তা অজানা। এরূপই একটি কর্মকান্ড বা অপরাধ হলো নেক্রোফেলিয়া বা প্যারাফেলিয়া।
প্রাচীন মিশরে সুউচ্চ শ্রেণীর কারো স্ত্রী মারা গেলে তার মৃতদেহ দাফন না করে মৃতদেহটিকে রেখে দেওয়া হতো। মৃতদেহটি যখন বিকৃত হয়ে যেত, তখনই সেই মৃতদেহটিকে সৎকার করা হতো। এর কারণ উদঘাটন করতে গেলে দেখা যায়, যদি তার মৃতদেহ সৎকার করা হতো এবং যদি তার পরিবারের কেউ নেক্রোফিলিক থাকত ; তাহলে মৃতদেহটির সাথে যে কাজগুলো করত, তা যে কি পরিমান বর্বরতা তা বলে বোঝানোর মত না। আর এজন্যই সেই মৃতদেহের পরিবারের লোকজন মৃতদেহ বিকৃত হওয়ার পরই সৎকার করত। আরে থেকে যে অপরাধের জন্ম হয়েছিল, সে সম্পর্কে কারো ধারনাই ছিল না।
প্রচলিত মিথ এ বলা আছে, রাজা হেরড তার স্ত্রী ম্যারিয়ানের মৃত্যুর ৭ বছর পর্যন্ত তার মৃতদেহের সাথে বসবাস করেছিলেন এবং নেক্রোফেলিক আচরণও করেছিলেন। আর এই নেক্রোফেলিয়া বা প্যারাফেলিয়াই হচ্ছে মৃতদেহের সাথে সহবাস। ইতিহাসের এই সমস্ত লাইনগুলো পড়তেই গায়ের লোম দাড়িয়ে যায় এই ভেবে, তারা কিরকম বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ ছিলো। ইতিহাস এবং প্রচলিত মিথে রাজা হেরড ছাড়াও রাজা ওয়ালডিনার এর নামও এসেছে।
এই অপরাধটিই যে কী ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, তা মানুষের ভাবনা চিন্তায় কখনও আসেনি। সেই প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ যে অমরত্বের সন্ধান করছে, সেটি কিন্তু কাকতালিও ব্যাপার না। আর এই অমরত্ব নিয়ে যে মিথগুলো প্রচলিত অ ও অমরত্ব কিভাবে পাওয়া যায়, এর সন্ধান এবং কিছু ধর্মীয় কর্মকান্ডও এর মধ্যে আছে।
প্রাচীন মিথ অনুযায়ী, ফিনিক্স পাখি যাকে বলা হতো চিরঞ্জীবী আগুন পাখি। এর রং ছিল বেগুনী ও নীল। এই ফিনিক্স পাখি বেঁচে থাকতো ৫০০ বছর। তারপরও জীবনের একেবারে শেষপ্রান্তে এসে দারুচিনির মতো সুগন্ধ লতাপাতা দিয়ে একটি সুন্দর ঘর বানাতো এবং সেই ঘরে আগুন লাগিয়ে সে নিজেই পুড়ে ছাই হয়ে যেত। কিন্তু তবুও তার মৃত্যু হতো না। কারণ সেই ভস্মীভূত ছাই থেকেই সে আবার জেগে উঠত আরেকটি অগ্নিবর্ণ ফিনিক্স পাখি হয়ে।
ফিনিক্স পাখির মতো অমরত্ব লাভের জন্য মানুষ এর মধ্যে আরেকরকম অপরাধের জন্ম নেয়। আর এর উপর প্রভাব বিস্তার করে ধর্মীয় কার্যাবলি। বিশেষ করে দেবতাকে খুশি করে অমরত্ব লাভের আশাই মানুষকে এরকম নরপশুতে পরিণত করে।
সভ্যতা যেভাবে আধুনিক হয়, মানুষের অপরাধবোধও তেমনি আধুনিক হয়, এটি বলা চলে। নেক্রোফেলিয়া-র মতো ব্যাধিটিও ক্রমশ অন্যরকম হয়। প্রাচীন ইতিহাসে দেখা যায়, এই অমরত্ব পিপাসু নরপশুরা প্রথমে কোনো একটি লোকালয় থেকে ডাকাতি বা ছিনতাই করার পর সেই লোকালয় থেকে একটি কুমারী তথা ভার্জিন মেয়েকে তুলে নিয়ে আসত। এরপর রাতে দেবতার সামনে সেই কুমারী মেয়েটিকে বেঁধে তার গলা কেটে তার শরীরের সমস্ত রক্ত বের করে নিত এবং সেই রক্ত দিয়ে তারা রান্না করে খেত। আর মৃতদেহটির সাথে তারা সহবাস করত। এতে তারা বিশ্বাস করত যে, এতে তাদের দেবতা তাদের উপর খুশি হয়ে তাদেরকে অমরত্ব দান করবে। কিন্তু এই নরপশুরা যে এতটাই নির্বোধ ছিল যে, তারা বুঝতও না যে এটি কখনও সম্ভব না।
মানবসভ্যতার ব্যাপক উন্নতি বর্তমানে হয়েছে, আর তার সাথে এই অপরাধেরও ব্যাপক উন্নতি হয়েছে বলা চলে। আঠারো, উনিশ এবং বিংশ শতাব্দীতে এই অপরাধের ধরণও আরও ক্রমশ ভয়ংকর হয়েছে। বিংশ শতাব্দীতে যে সমস্ত অপরাধগুলো পুরো পৃথিবীকে পুরো তাক লাগিয়ে দিয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম নেক্রোফেলিয়া। এই অপরাধের ধরণটি এমন যে কোনো সভ্য মানুষ শুনলেই তাদের গায়ের লোম দাড়াতে বাধ্য হবে। নেক্রোফেলিক হয়ে পৃথিবীতে এমন কিছু লোক ছিল, যারা ক্রমে সিরিয়াল কিলার-এ পরিণত হয়েছিল। এরকম কিছু মানুষের নাম না বললেই নয়। এদের মধ্যে - আমেরিকার আরলি নেলসন, জন ক্রিস্টি,হেনরি লি লুকাস অন্যতম।(সূত্রঃউইকিপিডিয়া)
বিকৃত মস্তিষ্কের এই মানুষ প্রথমে শহর থেকে কোনো কুমারী মেয়েকে অপহরণ করে নিয়ে যেত এবং তাদের গোপন কুঠুরিতে বন্দি করত। পরে সেই মেয়েটির জীবনে নেমে আসত এক বিভীষিকাময় মৃত্যু। মেয়েটিকে প্রথমে পুরো নগ্ন করা হতো এবং শ্বাস রোধ করে তাকে মেরে ফেলা হতো। এরপরই শুরু হতো সেই অপরাধীর জঘন্যতম পাপ। মৃতদেহটির সাথে সহবাস করত এবং মৃতদেহটি দড়ি দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হতো। এইভাবে টানা ৫-৭ দিন একই কাজ করার পর যখন মৃতদেহটি বিকৃত হয়ে যেত, তখনই অপরাধী মৃতদেহটি কোনো বস্তায় পুরে তা কোনো নর্দমা বা নদীতে ফেলে দিয়ে আসত। এমনও আছে যে, কোনো কোনো অপরাধীর হাতে নৃশঃসভাবে খুন হয়েছে প্রায় ৫০ এর বেশী কিশোরী।।
অদ্ভুত প্যারাফেলিয়াঃ প্রাচীন মিশর ও কিছু অপরাধ
Reviewed by Biggan Janala
on
April 16, 2020
Rating:
Reviewed by Biggan Janala
on
April 16, 2020
Rating:





No comments