গণিতের ইতিহাসঃ মানব চিন্তাধারার ক্রমোন্নয়ন
গণিতের ইতিহাসঃ মানব চিন্তাধারার ক্রমোন্নয়ন
-MD. Arifuzzaman
আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া সব ঘটনার পিছনে রয়েছে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা এবং বিস্তর অবদান। আর বিজ্ঞানের একটি অন্যতম শাখা হলো গণিত। একে বলা হয় language of universe। গণিত আছে বলেই আমরা জগতের অনেক কিছুর ব্যাখ্যা জানি। গণিতের যথার্থ ব্যবহার ও প্রয়োগের মাধ্যমে আমরা পেয়েছি একটি আধুনিক ও উন্নত সভ্যতা। প্রাগৈতিহাসিক মানুষ গণনা করতে পারত না, হিসাব তো দূরে থাক। তাহলে কালের ঠিক কোন দিগন্ত থেকে আবির্ভাব হলো সংখ্যার ধারণা? কে বা কারা প্রথমে পরিচয় করিয়ে দিলো গণিতের সঙ্গে, যার স্পর্শে পাল্টে গেলো মানব সভ্যতার ইতিহাস?
ইংরেজি mathemates শব্দটি গ্রিক "μάθημα" (মাতেমা) থেকে এসেছে যার অর্থ "বিজ্ঞান, জ্ঞান বা শিক্ষণ"। বর্তমানে mathematics বা গণিত বলতে পরিমাপ, সংগঠন, স্থান ও পরিবর্তনের গবেষণাভিত্তিক বিশেষ ধরনের জ্ঞানকে বুঝায়।
গল্পটি শুরু হয়েছিলো আনুমানিক ৫৫০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দে। বর্তমানের ইরানের দক্ষিণ অংশ তৎকালীন সময়ে মেসোপোটেমিয়া নামে পরিচিত ছিল। মেসোপোটেমিয়ার বাসিন্দা ছিল সুমেরীয়রা, যেটাকে আমরা প্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতা বলে চিনি। তারা ছিল পৃথিবীর প্রথম সুগঠিত ও শহরে বসবাসকারী মানবসম্প্রদায়। দৈনন্দিন প্রয়োজন ও ক্রয়-বিক্রয়ের হিসাব রাখতে সেখানে গণনার রীতি প্রচলিত হয়। যেহেতু তখনও কেউ লিখিত পদ্ধতি চালু করেনি তাই তারা মাটির তৈরি একধরনের টোকেন উদ্ভাবন করে এবং প্রতিটি টোকেন দ্বারা একটি অংক বুঝানো হত। এভাবে পেরিয়ে যায় প্রায় হাজার বছর। সুমেরীয় সভ্যতা ধীরে ধীরে কালের ধ্বংসলীলায় মিলিয়ে যেতে থাকে। নতুন সমাজের আবির্ভাব ঘটে এবং সুমেরীয়দের উদ্ভাবিত জ্ঞানের শিখা ছড়িয়ে পড়ে দূরবর্তী নীলনদের কোল ঘেঁষে যাওয়া আরবের আরেকটি ভূখণ্ডে। যা হল আজকের মিশর। জ্ঞানপিপাসু মিশরীয়রা গণিত ভালোবাসতো। প্রাচীন মিশরীয় শিশুরা বালিতে দাগ কেটে সংখ্যার কাল্পনিক প্রতিকৃতি একে খেলা করতো। নিখুঁত ও সুন্দর স্থাপত্য নির্মাণের জন্য প্রয়োজন নির্ভুল পরিমাপ । আর নির্ভুল পরিমাপের জন্য প্রয়োজন সংখ্যার সঠিক হিসাব। হিসাব ও পরিমাপ অপরের কাছে প্রকাশের জন্য তারা বিভিন্ন চিত্রলিপি যেমন বস্তু ও প্রাণীর প্রতিমূর্তি ব্যবহার করত যার কিছু নমুনা মিশরিয়ান হায়ারোগ্লিপে পাওয়া যায়। কাটলো হাজারো কয়েকবছর, সুদূর গ্রীস থেকে এক বিদ্যানুরাগী আসলেন মিশরে অধ্যয়ন করার জন্য। সেই ব্যক্তিটি মিশরের প্রযুক্তি দেখে অভিভূত হন। গণিতকে তিনি মনেপ্রাণে ভালোবাসতে থাকেন এবং নিজ দেশ গ্রিসে ফিরে এসে গণিত শিক্ষার একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি হলেন পিথাগোরাস। পিথাগোরাস মনে করতেন মহাবিশ্বের সব লুকায়িত সৌন্দর্যের রহস্য হচ্ছে সংখ্যা। তিনি লক্ষ্য করেন দুটি আলাদা বস্তুর ওজন যদি কাছাকাছি কোন পূর্ণ সংখ্যার অনুপাত(যেমন ৩:২ অনুপাত ওজনের দুটি আলাদা মাটির পাত্র) হয় তাহলে তাদের আঘাত করলে সাদৃশ্যপূর্ণ সুরেলা আওয়াজ উৎপন্ন হয়।
এই মাধুর্য ধ্বণির মিলনের পেছনে আছে সংখ্যার অনুপাত বিন্যাস।
পিথাগোরাসের মৃত্যুর ২০০ বছর পর গ্ৰিসে জন্ম হয় আরকিমিডিসের । সংখ্যা নিয়ে তার এতো জ্ঞান ছিলো যে , তিনিই প্রথম প্রমাণ করেন যে " একটি বৃত্তের ক্ষেত্রফল তার ব্যসাধের বর্গের এবং পাই এর গুণফলের সমান " । তিনি ক্যালকুলাস এ ব্যবহৃত অতি ক্ষুদ্র সংখ্যার ধারণা ও অতি ক্ষুদ্র কোনো সংখ্যাকে ছোট আকারে প্রকাশ করার পদ্ধতিও তিনি বের করেন। গ্ৰিকদের উদ্ভাবিত পন্থাকে রোমানরা পুরোদমে ব্যাবহার করে গাণিতিক সফলতাকে আরো একধাপ এগিয়ে নেন। রোমানদের ব্যাবহৃত রোমান সংখ্যা আজও প্রচলিত। গণিত বিপ্লবের এত সহস্ত্র বছর পেরিয়ে গেলেও একটি সংখ্যার ব্যাবহার লোকেরা জানত না , সেটি হলো শূন্য । যদিও প্রাচীন মিশরীয়রা শূন্যকে কেবল প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করত এবং তারা এটাকে নফর(nfr) নামে ডাকত । কিন্তু শূন্য তখনো সংখ্যার মর্যাদা পায়নি । শূন্য সংখ্যা হিসেবে প্রথম ব্যবহার শুরু করে ভারতীয় গণিতবিদরা । তারাই শূন্যকে পুরো বিশ্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন ।
ভারতীয়রা বহু প্রাচীন থেকেই জ্যোতিবিদ্যায় ও সংখ্যাবিদ্যায় পারদর্শী ছিল । পৃথিবী নিজ অক্ষের চারদিকে সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণায়মান। তারা কোপার্নিকাসের জন্মের প্রায় এক হাজার বছর আগে এ তত্ত্ব প্রদান করেন। সর্ব প্রথম পৃথিবীর ব্যাস নির্ণয় করেন ভারতীয়রা, যেটা এতোটাই সুক্ষ ছিলো যে, আজকের হিসেবের সঙ্গে শতকরা ৯৯ ভাগেরও বেশি মিলে যায়। আর এগুলা সবই সম্ভব হয়েছিলো সংখ্যার নির্ভুল গণনার মাধ্যমে। ভারতীয়দের থেকে শূণ্যের ব্যবহার শিখে নেয় আরবরা।
আরবদের মধ্যে থেকে আল খোয়ারিজমি, যার জন্মস্থান নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে, তাকে আধুনিক বীজগণিতের জনক বলা হয়। তিনি সর্বপ্রথম আ্যালগরিদম উদ্ভাবন করেন। এই আ্যালগরিদম ব্যবহার করে সব কিছুকে ডিজিটালভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে। আরবীয় বণিকদের কাছ থেকে শূণ্যের ব্যবহার সম্পর্কে অবগত হন তৎকালীন উত্তর আফ্রিকার বণিকেরা। তারপর সপ্তদশ শতকে গটফ্রিট লিবনিত্সনামের একজন জার্মান গণিতবিদ বাইনারি সংখ্যা পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন যাতে সকল সংখ্যাকে ০ ও ১ দিয়ে প্রকাশ করা হয়। এই সংখ্যা পদ্ধতির ভিত্তি দুই।
ডিজিটাল ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির লজিক গেইট এ বাইনারি সংখ্যা পদ্ধতির ব্যাপক প্রয়োগ হয়েছে। বাইনারি পদ্ধতিতে প্রতিটি অংককে বিট বলা হয়। এ রকম ৮ বিট মিলে ১ বাইট। ১০০০ বাইটে ১ কিলোবাইট (কখনো কখনো ১০২৪ বাইট = ১ কিলোবাইট ধরা হয়) । কিলোবাইট থেকে গিগাবাইট ইত্যাদি। আজকের পৃথিবীর প্রতিটি ডিজিটাল যন্ত্রের মেমোরিই বিট আকারে
জমা থাকে। এভাবেই সংখ্যার জাদুকরী স্পর্শে আমরা পাল্টাতে পেরেছি। বিজ্ঞানের কোনো কিছুর সঠিক বাস্তবতা নির্ণয়ে গণিতের ব্যবহার অপরিহার্য। গণিতের ব্যবহার অর্থাৎ প্রয়োগ ছাড়া বিজ্ঞানচর্চা সম্ভব না। আর বিজ্ঞানকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করার জন্য গণিতে পারদর্শী হওয়ার বিকল্প নাই।
গণিতের ইতিহাসঃ মানব চিন্তাধারার ক্রমোন্নয়ন
Reviewed by Biggan Janala
on
January 30, 2021
Rating:
Reviewed by Biggan Janala
on
January 30, 2021
Rating:

Awesome ...Informative topic.
ReplyDelete